বহুকাল আগে দেখা একটি স্বপ্ন কেন জানি মনে পড়ছে। গ্রামের বাড়ি, বাইরে তালগাছ, ঝড়ো মাতাল-উদ্দাম প্রকৃতি – হঠাৎ নিজেকে আবিষ্কার করলাম নাবিকের বেশে। একি! আমার জাহাজ দুলছে কেন? প্রশান্তের বুকে অশান্ত কাপ্তান আমাকে আদেশ করেই চলেছেন। খুব ভয়ংকর শব্দ – “আম্মু” বলে চিৎকার দিয়ে উঠলাম – আম্মু পাশেই ছিল। এখন মা পাশে নেই। এই তো ছ’বছর বাড়ি থেকে শত মাইল দূরে মরুভূমিতে মাকে ছাড়া বেশ আছি তো। তাও কেন জানি মাঝে মাঝে মায়ের কথা মনে পড়ে। মুখ ফুটে বলা হয়নি মাকে কখনো।
আমি অনেক লিখি, কিন্তু সব ওই মুখপোড়া ইংরেজিতে, তাও হিজিবিজি – সাহিত্য, ইতিহাস, রাজনীতি। আর যা দু-এক বাক্য বাংলা লিখি, তাও দূরদ্বীপের কোনো বসন্ত মঞ্জুরীকে নিয়ে। এসব তো আর মাকে দিতে পারি না। “মা” শব্দের প্রতিও আমার তেমন ঝোঁক নেই; বরং, “আম্মু” বললে হয়তো আরও একটু বোধের উদয় হয়। তাও স্রেফ কিছুক্ষণ – তারপর মিলিয়ে যায়। দূরত্ব অনেক – আমি ছুটছি আলোর বেগে – মা আমাকে ছোঁবেও বা কীভাবে?
আমার মা আক্ষেপের সুরে কেন জানি বলেন, “আমার কোনো মেয়ে নেই।” সেবার যখন জানতে পারল আবার ছেলে হবে – তার এত সাধ করে ঠিক করে রাখা নাম – জান্নাতুল মাওয়া – কোথায় যে মিলিয়ে গেল! আক্ষেপ থাকা স্বাভাবিক।
মাকে দোষ দেব না, দোষ যদি থাকে সে আমারই। মা খুব ভীতু প্রকৃতির। আজও নাকি ফজরের পর ঘুমিয়ে স্বপ্নে দেখেছে – আমি পরীক্ষার হলে বসে কাঁদছি। কল দিতেই উৎকণ্ঠা আঁচ করলাম, শান্ত করার চেষ্টা করলাম। অনেক আগে – একটু বুঝতে শিখেছি – মা আমাকে নিয়ে একা গ্রাম থেকে মফস্বলে এলেন – শুধু আমার জন্য। নতুন জায়গা – বাজার করা, রান্না করা, স্কুলে নেওয়া, মাইলখানেক পথ হেঁটে মক্তবে নেওয়া, মাগরিব বাদে ঘরে কেন ফিরছি না সে উৎকণ্ঠা, সন্ধ্যায় ঘাড় ধরে টেবিলে বসানো, সব শেষে রাতে এক গ্লাস হরলিক্স – এই প্রত্যেক কাজের মাঝে দুবার করে ইনহেলার আর সাথে সেই চিরচেনা এক বাক্স ওষুধ, এই যেন ছিল মায়ের নিত্য রুটিন। এই মরণব্যাধি হাঁপানিও আমার জন্য – আগস্টে জন্ম আমার – দুমাস বাদেই শীত – যশোরের কনকনে ঠান্ডা। মা বাঁধিয়ে ফেললেন হাঁপানি। এখনো রীতিমতো ভুগছেন, কিন্তু কাউকে হয়তো বলেন না সেভাবে, ভীতু যে! সে বছরই পুকুরের ধারে পানি আনতে গিয়ে মাথায় চোট পেলেন। প্রায় এক যুগ ভুগলেন মাথাব্যথা – ইনসমনিয়া, রাতে ঘুম আসে না। তবুও প্রতিদিন সকালে ‘ফাবি আইয়ি আলা ই রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান’-এর ধ্বনিতে আমার ঘুম না ভাঙিয়ে নিস্তার দিতেন না। সত্যি বলতে, আমাকে যদি কখনো স্রষ্টা সাহসী করতে চান, আমি হাত জোড় করে – মায়ের মতো ভীতু হতে চাইব!
সত্যিই প্রতিপালকের কোনো রহমত আমি অস্বীকার করব? মা আমাকে বারবার বলেছেন তার নাকি কিছুই মনে থাকে না – চাবি কোথায়, কার্ড কোথায় – কিন্তু কই, আমার নিজের হাতে হারানো কাগজপত্র মায়ের খুঁজে বের করতে তো এক মুহূর্ত লাগে না! নিজের বেলাতে তিনি ভীতু, ভুলোমনা; আর আমার বেলা কেন এত সাহসী, বুদ্ধিমতী? নিজের শরীরের যত্ন নেওয়ার ব্যাপারে কত নিষ্ঠুর, কিন্তু আমার বেলা – কে বলেছে তাকে এত দরদী হতে? আমি এসব কিছুরই যোগ্য না।
তবুও আমার কপালে এসে জুটলো জগতের সেরা মা! কিছু জিনিস আমি কখনো বুঝিনি হয়তো মায়ের জন্য – পারিবারিক কলহ, অশান্তি। যদিও নিজে একবার এর ভয়াল থাবায় কুপোকাত হয়েছি – তাও নিজের দোষে। বারবার অপরাধ সত্ত্বেও আম্মু আমাকে ছেড়ে যাননি, হয়তো কখনো যাবেন না। যে বোকা মা তিন ঘণ্টা পরপর কাঁচা ঘুম থেকে উঠে আমার চোখে ড্রপ দিতে পারে, কিংবা ঢাকার অসহ্য জ্যাম ঠেলে অপদার্থের জন্য ওষুধ নিয়ে আসতে পারে, সে মা আর যা হোক, আমাকে ছেড়ে যাচ্ছে – না, তা হতেই পারে না।
বাইরে তুমুল বৃষ্টির ধারা যেন থামছেই না, আকাশ যেন ফেটে পড়েছে আজ, তবুও শুধু থেমে আছে আমার নিষ্ঠুর চোখের দুই পাথর। একবিন্দু চোখের জল কি কোনোদিন গড়াবে না এই অপদার্থের – তোমার জন্য? কি অকৃতজ্ঞ আমি?
আম্মু, তুমি কেন এত সুন্দর? তুমি তো সত্যের চেয়েও মহান, সময়ের চেয়েও প্রাচীন, প্রবাল-দ্বীপের স্বচ্ছতাও তোমার কাছে ফ্যাকাসে।
কী করে তোমার গর্ব হব, মা?

