আজও বৃষ্টি হচ্ছে। বজ্র মেঘের ঝঙ্কারে মাতোয়ারা ঝিমঝিম বর্ষণ। বাংলার মনসুন, আহা! চাট্টিখানি কথা নাকি?
তবু যে যাই বলুক – আমি বসন্তের পূজারী। ফুল বড্ড বেশি ভালো লাগে যে – সব ফুল নয়। গোলাপ নয়, হাসনাহেনা নয়, রজনীগন্ধা নয় – সে এক অন্য ফুল। তার দোলনচাঁপার মতো সুন্দর নাম নেই, বীথির মতো সুরেলা টান নেই, শাপলার মতো কদরও নেই – বাহারি রঙও নেই। রাস্তার পাশে ফোটে, ছোট চারখানি পাপড়ি, শ্যাম গোলাপী রঙ।
ভারী বৃষ্টিতে ভিজে এলাম। অলিভ অয়েল-সিক্ত পিচ্ছিল হাতে কলমেও যেন খুব একটা জোর পেলাম।
অবাক হচ্ছো – এ কেমন লেখক রে, বাবা – খালি নিজের কথা বলে?
কেন বলব না, নিজের কথা? আমার আমি সত্তা তো আমার অতি আপন।
দোলনা হতে কবর পর্যন্ত – এই এক সত্তা কী দয়াময়, নিঃস্বার্থ। কখনো শুনেছ – অমুক নিজে নিজেকে কষ্ট দিয়েছে, বাম গালে কষে থাপ্পর মেরেছে – কখনো এমন হয় না। পারিপার্শ্বিক অবস্থা, ক্ষেত্রবিশেষে আপনজন, বন্ধু – আত্মীয়, এমনকি মনগড়া – জাত, বর্ণ, গোত্র – আরও হাজারো মহল থেকে মনোজগতে সে কী চাপ – যেন অস্থির করে তোলে।
কিন্তু ওই যে লুকায়িত বোধ – যে তোমার সাথে কথা বলে চলেছে – তুমি দুঃখ পেলে বারবার বলেছে – যাও, সুখেরও সন্ধানে যাও – তার কথা ক’জনই বা লেখে?
ক্ষুদ্র জীবন আমার, জ্ঞান নগণ্য – জানি কম, মানি যেন তার থেকেও ঢের কম। এক মহান লেখকের অমর সৃষ্টি, বিখ্যাত এক চরিত্রের কথা মনে পড়ে গেল। অপূর্ব – যদিও সবাই তাকে অপু বলেই চেনে। বই ধরেছিলাম – প্রথম খণ্ড শেষ করলেও, এত দুঃখ সামাল দিয়ে দ্বিতীয় খণ্ডে বেশি দূরে যেতে পারিনি। নিজের দুঃখ দেখে কে – আবার কোনো কল্পিত নভেলের নায়কের দুঃখ। তবু প্রসঙ্গ উঠালাম – কারণ আমরাও অপূর্বর ন্যায় খুব বেশি ছুটছি।
উদ্দেশ্য মহান। কেউ অর্থ, কেউ জ্ঞান, কেউ নিছক আনন্দ, কেউ সঙ্গ – কিন্তু ছুটে চলা যেন নিরন্তর। একটুও ফুরসতের জো নেই!
Escapism – এর মতো নিষ্ঠুর শব্দ আমি আনতে চাইনি। কিন্তু নিজেকেই প্রশ্ন করো না। এই যে আমি মরিয়া হয়ে বন্ধু খুঁজছি – তা কি নিজের দুঃখ ঘুচানোর জন্য নয়? বা তুমি হয়তো সাফল্য খুঁজছো – তাও কি নিজের অস্তিত্বের প্রশ্ন থেকে বাঁচার জন্য নয়? কিন্তু আর কত?
মন কি তোমার চায় না – এক আধবার তীরের ধারের কাকটার দিকে চেয়ে থাকতে? কত অর্থ ব্যয়ে তুমি দিগ্বিজয়ী শহরের পানে নিশাচরের মতো সুখ খুঁজছো – একটিবার থমকে দাঁড়াও – পাহাড় সম বোঝা তোমার – জানি, সব জানি। কিন্তু তা থেকে একটি নুড়ির বোঝাও যদি আমাকে দাও – তাতেও কি একটু হাফ ছেড়ে বাঁচা হলো না?
আমি কে? কৌতূহল জাগছে? — আমি, তুমি।
উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা কিংবা
উল্লাসের উজ্জীবন, তবুও—
মনের আস্তাবলে ঘুমন্ত,
আজও দাঁড়িয়ে।
ঝঞ্ঝার ঝঙ্কারে কিংবা
প্রেমাসিক্ত পৃথ্বীর করতালে,
সুন্দর উপত্যকায় সুপ্ত,
সব ছাড়িয়ে।
ঘূর্ণির দুর্বিপাকে কিংবা
পূর্ণিমার কুঠিরে—
বাঁধন ছিঁড়ে, হাত বাড়িয়ে,
কে ডাকে— তোমাকে?

