বাইরে বোধকরি ঝিমঝিম বৃষ্টি টুপটুপ করে পড়ছে। সকাল থেকেই, তা পরুক না। সন্ধ্যায় যখন একটু গা এলিয়ে ভাবনায় মগ্ন—কত শত চিন্তা!লিখতে গেলে কি এসব চিন্তা লাগে? লাগে হয়তো—কিন্তু সে তো মনের লেখায় লাগে না। তাহলে লাগেটা কী?
নিস্তেজ, নিস্তব্ধ, নিঃসাড় — নরকঙ্কাল কি লিখতে পারে? নাকি সতেজ, উজ্জ্বল, পূর্ণ এক সত্তাই কেবল লেখক হতে পারে?
আগে নিজেকে প্রশ্ন করি — আমি কখনো প্রেমে পড়েছি? প্রেম কী? প্রেমিক কে? শত ছন্দের উথাল-পাথাল কল্লোল সিক্ত, কোমল তীর্থের কাক কি প্রেমিক? কে প্রেম? ব্যথা, যাতনা—বাসনা? প্রেম যেন এক বিষণ্ণ সুন্দর সকাল, পৃথ্বীর বুকে এক স্বপ্নের জাল।
আমি বোধহয় একজনকে ভালোবাসি। আগেও ভালোবেসেছি তাকে। কিন্তু, এবার বোধহয় সত্যিকারের ভালোবাসা। জানো, তাকে কেউ ভালোবাসেনি কখনো! সবাই—সবাই তাকে ছেড়ে গিয়েছে। তারপর সেও আমাদের ছেড়ে গেল। কার কথা বলছি জানো? আমার বন্ধু তাকে গ্রামীণ মেয়ে বলেছে, আমি বলেছি রবীন্দ্র মেয়ে।
তার দোতলা বাড়ির এক কোণে ঠাঁই ছিল — ঠাঁই বলছি কেন? বাড়িটাই তো তার ছিল। শয়নকক্ষে বেলজিয়াম আয়না ছিল, রূপ ছিল, দু-হাতে বালা, কোমরে ঝুনঝুন চাবি — সব ছিল।
তাকে আমি প্রথম দেখি জাম রঙের শাড়িতে, ঠিক বারান্দার ধারে। এক রত্ন হাসি নিয়ে সে আমাকে প্রথম ডেকেছিল—হে সখা।
আমি তার রূপের তুলনা দেব না—নিতান্তই অপারগ। শুধু বলি গ্রিক দেবী হেকাটি—তিন জগৎজয়ী মুখ কিংবা লক্ষ্মীর সরু কঙ্করে আবৃত মায়াময় হাত, সব—সব সে মায়াবিনীর রূপের কাছে নগণ্য!
আমার পরিচয়টাই দেওয়া হলো না। আমি ছিলাম দেবীর নামহীন স্তাবক। তবুও দেবী আমায় ডাকলেন—হে সখা!
কত কবিতা শত গীতি
পঙক্তি ও জড়তা
তবুও তোমার চরণে
সব চুপ—সব চুপ
জানো আজ খুলিয়াছে দ্বার
সবই মায়া তোমার
ছলনা—ললনা কেন সত্য বলো না?
ভেঙেছে বাঁধ, কত যে সাধ
হে দেবী চলো না—
আজ আমার সত্যি কোনো ব্যথা নেই, নেই কোনো যাতনা! কিন্তু সেদিন তো আমার সবই যেন এক অন্তিম বিষাদে ছেয়ে ছিল। এক মায়া কান্না জুড়ে বসেছিল আমার অন্তরে। তবে আজ কোথায় সেসব?
তবে কি, আজ সত্যি কি আমি নতুনেরে ডাকি — নাকি পুরাতন বলে কিছুই ছিল না?
ওসব থাক, জানো শাড়ি সবচেয়ে সুন্দর—সাথে কোমর ছোঁয়া চুল। লাল পেড়ে শাড়ি কি সবচেয়ে বেশি সুন্দর?
আমি জানি, এসব একদিন নিঃশেষ হবে। নিজের ভাষা নেই। জীবনানন্দের থেকে দু-চরণ ধার নেই—
সেই দিন এই মাঠ স্তব্ধ হবে নাকো জানি
মৃত্যু কি সুন্দর? তোমাকে এত বেশি এঁকেছি এই হৃদ-মাঝে, তুমি তো আজ মৃত, দেবী! আমি জানি, বেঁচে থেকেও তুমি যেন নেই। তোমার অস্তিত্ব—আমার আত্মার থেকেও সত্য; কিন্তু, আমার থেকেও মিথ্যা!
তুমি তো নেই!
ভাবছো তাও আমি কিভাবে লিখি, তাও বলেই ফেলি—যদি আঁকতে পারতাম তবে ভিঞ্চির মোনালিসাকে তোমার ভৃত্য বানাতাম, বিশ্বাস হয় না? তোমার রূপ যদি পিয়ানোর সুরে বিধতে পারতাম তবে অরফিয়াস এসে তোমার পায়ে পড়তো। কিছুই কি বিশ্বাস হচ্ছে না তোমার?
আজ আমার রূপকের আওয়াজ নিতান্ত নিরুপায়— হয়ত একেই বলে প্রেম! লিখতে গেলে এই প্রেমকে লাগে—তোমাকে লাগে!
তুমি আছো, কিন্তু দূরে কোথাও — লুকিয়ে। গ্রামীণ মেয়ে হয়ে ভৈরবে স্নান করছো বা হয়তো ডিঙ্গি নৌকায় ইছামতী পার হচ্ছো। হয়তো পাহাড়ি স্রোতে ভেসে যাচ্ছো কোনো গহীন বনে বা আদিবাসী কোনো গ্রামে।
তোমার ডান হাতে চিরুনি, একরাশ কালো কেশের চাদরে আবৃত কুহেলিকা তুমি।
জেনে রেখো দেবী—আমিও কম যাই না। যতদিন তুমি আছো আমার সিকি মূল্যের বলপয়েন্ট কলমখানি ছুটে যাবে অবান্তর—এঁকে যাবে তোমার ছবি।
তাই লিখতে গেলে শুধু তোমাকেই লাগে—তোমাকে।